এই লেখকের বই

ভ্রমণ-কাহিনী

সুন্দর নেহারি, তীর্ধের পথে, রূপমতীর দেশে, কানাড়া দেখা হল না

ব্রম্যাণি বীক্ষ্য

১. অন ২. তামিল ৩. কেরন ৪. কর্ণাট ৫. কালিন্দী

৬. রাজস্থান ৭. সৌরাষ্ট্র ৮. কোঙ্কণ ১৯, অবস্ভতী ১০. উৎকন

১১, মগধ ১২. কোশল ১৩. হিমাচল ১৪. কাশ্মীর ১৫. কামরূপ ১৬. গৌড় ১৭. ভাগীরথী ১৮. হিমালয়

ভ্রমণ-কাহিনীর সঙ্কলন

শ্রীমনুষম। চক্রবতণর সহযোগিতায় শতবর্ষের পথযাত্রা

ছোটদের জন্য

আমাদের দেশ ১, উডিষ্যা ২. অন্ধ মহিসুর ৪. তামিলনাড়ু

শাশ্বত ভাবত ১. দেবতার কথা ২. খষির কথা ৩. অস্বরের কথা ৪. উপদেবতার কথা

উপন্যাস ভ্রমণ-উপন্যাস

বূপম্‌ 2, চোখের আলোয় দেখেছিলেম, মণিপদ্ম, তুঙ্ষভদ্রা, আয় চাদ, আরও আলো, মৌন মন, তারার আলোর প্রদীপখানি, একজন লামা মানস সরোবর, কুটিল কুমায়ুন, কেরালার উপকূলে, বাধ ভেঙে দাও, তারা ভেসে চলেছে, কাশ্মীরী বাহার, অয়ি অবন্ধনে, কী মায়া, জনম জনম মেঘ, কন্ষিরুবাচ, একটি আশ্বাস, সেই উজ্জ্বল মুহুর্ত

বমসণি বীক্ষ

উপন্যাস-ব্রসসিক্ত ভ্রমণ-কাছিনী

শ্ীসবুবোধকুমার চক্রবতী।

রি ২০০ পতি রে নত নি

টি থু £ রী 21% -) শন রম

(1১০53 2 3

118,

ব্ঞ. রর 8 ইত ২:-০.১৪৮ ২০৮

এ. মুখাভী আযাও কোম্পানী প্রাঃ লিঃ কন্সিকাতা-৭০০৪৭৩

[২1৬৬ 72274 1৮210-131717121 ৮১৪৮৪, 85 90০9017৫172 01021095910

প্রকাশক £

জয়ত্তী চট্টোপাধ্যায়

মানেজিং ডিরেক্টার

এ. মুখাজী আগু কোং প্রাঃ লিং

২, বঙ্কিম চাটাজী সর, কলিকাতা-৭০০০৭ *

সরকার প্রদত্ত কাগজে মুদ্রিত পন

প্রথম প্রকাশ- শ্রবণ, ১৩২৪ / রা

মূল্য ১৮০০ ( আঠারো টাক চার্চে প্লে ,

রে -২

প্রচ্ছদ শিল্পী ? শ্রীসুধীর মৈত্র ব্লক £ স্ট্যাগুড ফটো! এনগ্রেভিং কোং

মুদ্রাকর £

শ্রীরণজিতকুমার দত্ত

নবশক্তি প্রেস

১২৩ আচাধ জগদীশচন্দ্র বসু রোড কলিকা ত1-৭০০০১৪

সর্গ যাদের সঙ্গে একান্ম হবার চেষ্টা কবে€ বার্থ হায়েছি, সেই তাপদগ্ধ মরুবাসীদের উদদে/শ

€1/

গ্রন্থকার রম্যাণি বি. এফ. ৭৭, সন্ট্‌ লেক সিটি, কলিকাত।-৬৪

যদেমি পরশ্ষুরমিব দূততি ধাতো আদ্রিবঃ। সি মৃড়া নক্ষত্র মুড়য়

এক _খগবেদঃ ৭৮৯৭ ফায়গ'

যদি ঝড়ের মেঘের মতো আমি ধাই চঞ্চল-অস্তর

তবে দয়! কোরো হে, দয়া কোরো হে, দয়া কোরো ঈশ্বব |

_ রবীন্দ্রনাথ

বলতে

কেউ তনক দিন পরে আবার দিল্লীতে এসেছি আমি আর স্বাতি।

র'সেমিনারে যোগ দিতে এসেছি এটা সভা-সমিতির যুগ-_ সেমিনার, কনফারেন্স, সিমপোসিয়াম, ওয়ার্কশপ, ডায়ালোগ এক এক ব্যাগ্ধারে এক এক নাম। কাজ কতকটা একই। নানা

য়গার প্রতিনিধিরা এক জায়গায় মিলিত হয়ে নান! বিষয়ে আলাপ-

আলোচনা করবে। তার পরে ছুটি। আমাদেরও ছুটি হয়ে গেল।

কলকাতা ছেড়ে বেরোবার সময় ম্বাতি বলেছিল : অনেক দিন কিছু লেখো নি। আবার লিখতে হবে

আমি উত্তর দিয়েছিলুম : নতুন জায়গা যে আর খুজে পাচ্ছি না!

আশ্চর্য হয়ে স্বাতি বলেছিল; সে কি! ভারতবর্ষ কি এত ছোট দেশ যে এমন সহজে ফুরিয়ে যাবে !

আমি হেসে বলেছিলুম £ আঠারোটা! পর্বে যে মহাভারত শেষ হয়ে গিয়েছিল !

স্বাতিও হেসে বলেছিল £ হরিবংশ মহাভারতের খিল পর্ব

হা, খিল মানে তো পরিশিষ্ট বাকি যা আছে তা নিয়ে খিল পব.হতে পারে অ' হাসতে হাসতেই. স্বাতি বলেছিল £ পরিশিষ্ট অনেক সময়েই

টায় কুলোয় না।

গামার পাঠকেরা তা হলে আমায় খুন করবে।

খুন করবার আগে প্রতিবাদ করবে তো, তখন থেমে

দিল্লীতে এসে এই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিল স্বাতি। পরিচিত তু-একজানর সন্ধে আলোচনাও করেছিন। আমার পরিচয় জেনে

মরুভ' (ত পৰ-১

আলাপ করভে এসেছিল এক তরুণ অধ্যাপক নাম বালুর বাপ-প্'তামহের পদবী ত্যাগ করেছিল বলে কোন্‌ রাজ্যের মানু” তা বোঝা যাচ্ছিল না। সুন্দর সুশ্রী চেহারা, গৌর বর্ণ, প, খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি। প্রসন্ন মুখে আমার কাছে এসে ন্/ করে বলল আপনাকে আমার হিংসে করতে ইচ্ছা করছে।

কেন?

গোটা ভারতবর্ষটাই আপনি দেখে ফেলেছেন শুনলাম

হেসে বললুম £ গোটা ভারতবর্ষ দেখেছি, কথা কেউ দাবী করতে পারে না। ভারতবর্ষ দেখার শেষ আছে বলে আমি বিশ্বাঃ। করি না।

তা সত্যি। বড় বড় কয়েকটা! শহর দেখেই আমরা ভাবি, সার! দেশটা আমাদের দেখা হয়ে গেল।

তার পরেই বলল এই আমার কথাই ধরুন না আমার নাম তো বালুরাম। আমি ভাবতাম বালির দেশটা আমার জানা আছে।

নতুন এক যুবকের সঙ্গে আলাপ করতে দেখে স্বাতি এগিয়ে এসেছিল বলল £ বালির দেশ কাকে বলছেন ?

বালুরাম বলল £ রাজস্থানের মরুভূমি এই "মরুভূমির দেশে জন্ম বলেই তো আমার ঠাকুরদা বালুরাম নাম রেখেছিলেন ! তাই মনে একটা গৰ ছিল, মরুভূমির সব কথা জানি

স্বাতি বলল জানেন না বুঝি ?

সেবারে একটা কাজে জয়শলমেরে গিয়েছিলাম একটা -দশ- বারো বছরের ছেলে আমার মাল নামিয়েছিল ট্রেন ৫. দু-একটা কথার পরেই সে আমাকে বলেছিল, জানো, দেন আকাশ থেকে ফোটা ফোট। জল পড়েছিল

স্বাতি বলল : বৃষ্টি !

হ্যা, বৃষ্টি কিন্তু সেই ছেলেটা বৃষ্টি পড়তে কখনও দেখে নি। জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, যে গ্রাম থেকে সে এচমুছে সেখানে আট.

বঙ্গ পরে কয়েক ফোটা জল পড়েছে তার জন্মের পরে যে একটু বৃ্টি হয়েছিল, সে কথা তার মনে নেই

একটু থেমে বালুরাম বলল £ দেশের মানুষ *র্বাচে কী করে বলতে পারেন! কেউ দেখে তাদের ! কেউ ভাবে তাদের কথা! কেউ তাদের কথা কখনও লিখেছে !

লাপুরামের ছু চোখ ছল ছল করে উঠল। আর স্বাতি নির্বাক চঠ্রে গেল। আমি বললুম £ সত্যিই আমরা সামান্যই দেখেছি। মার এই দেখ'পনয়েই গৌরব বোধ করি।

বালুরাম বলল £ রাজস্থানের অর্ধেকটাই তো মরুভূমি উত্তর- পাশ্চমের অর্ধেক। ভূগোলে তার নাম থর! পশ্চিমে আরব সাগরের উপকূল পর্যন্ত এই মরুভূমি বিস্তৃত

স্বাতি বলল পশ্চিম উপকূলে তো কচ্ছ !

সেও এক বিচিত্র দেশ। ভুঁগোলে যার নাম রন, রন অব কচ্ছ। চোখে না দেখলে সে জায়গাও কল্পনা করা যায়*না। এই মরুভূমি যেন ভারতবধ নয়, যেন আরব কিংবা মিশর ফসল হয় না, শীক-সব্িও হয় না, পানীয় জলের জন্য মাইলের পর মাইল অতিক্রম করতে হয় উট কিংবা গাধা নিয়ে বালি খু'ড়ে জল বার করে সেই জল এনে সঞ্চয়* করতে হয় ঘরে। তবু এখানকার মানুষেরা বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে মনের জোরে ভাগ্যকে তারা ধিক্কার দেয় না, সবকারের বিরুদ্ধে করে না বিদ্রোহ, ভগবানের কাচছ্ছগও কোন নালিশ নেই তাদের এরা মরুভারতের মানুষ, অজ্ঞাত উপেক্ষিত মানুষ। এদের কথা কি আপনি লিখবেন না ?

অনুরোধে আরজ হল বালুরামের কণ্ঠস্বর আর স্বাতি আমার মুখের দিকে তাকাল গভীর প্রত্যাশায়

বালুরামকে আমি নিরাশ করতে পারলুম না। নিবিড় ভাবে নাড়া দিয়েছে সে আমার মনকে বললুম লিখব কিন্ত-_

বালুরাম আমান ছু হাত জড়িয়ে ধরে ধলল £ এর মধ্যে কোন

্)

কিন্তু নেই পৌপালবাবু, আমি আপনাকে সাহায্য করব। আতার যতটুকু, স্টরমর্থ, তার সবটুকু আমি আপনাকে দেব। দিল্লী থেকে আপনি ফিরে যাবেন না

তবে?

কাল রাতের গাড়িতে আমরা বিকানের যাত্রা করব। একটি বেলা আমাকে সময় দিন, এরই মধো আমি সব ব্যবস্থাখ্করে ফেলব।

বালুরাম চলে যাবার পরে ম্বাতি বলল: কলকাতা থেকে বেরোবার সময় দেবতার কাছে এই প্রার্থনাই আমি করেছিলাম

আগামীকাল সকালে কোথায় যাওয়া যায়। তাই ভাবতে গিয়েই কিছুদিন আগের কথা আমার মনে পড়ে গেল। ববিবারের এক সকালে আমরা দিল্লী শহরটা দেখেছিলুম আমরা মানে রায় সাহেব অঘোর গোম্বামী এম. পিন বাঙলার জমিদার, মিসেস গোন্বামী তাঁদের মেয়ে স্বাতি। সঙ্গে ছিল দিল্লীর ছেলে রাণা তার বোন মিত্রা, আই. সি. এস, ব্যানাজি সাহেবের পুত্রকন্তা] | কলকাতা থেকে এসেছিলুম এলাহাবাদ, দিল্লীতে বেড়াতে এসেছিলুম। রক্তের সম্বন্ধ নেই, তবু মামা তারই নিমন্ত্রণে এসেছিলুম

এলাহাবার্দের জ্ঞানশঙ্করবাবুর কথাও আম্বার মনে পড়েছে। অপুত্রক মানুষ অথচ প্রচুর সম্পত্তির অধিকারী আমাকে দত্তক নিতে চেয়েছিলেন। এক ছুবল মুহুর্তে আমি রাজী হয়ে গিয়েছিলুম |

দুপুরে আহারের পৰে ব্যাতিব সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। আমার পাশে একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে স্বাতি জিজ্ঞাসা করল £ একটু আগে বাবার সঙ্গে কী কথা হচ্ছিল গোপালদা ?

চারি ধারটা একবাব ভাল কবে দেখে নিয়ে বললুম তোমার বিয়ের কথ্ণ।

স্বাতি একটুও লঙ্ভিত হল না। বলল £ চমৎকার কথা তো ! তা আমার আড়ালে কেন?

হেসে যোগ করল £ কত দুখ কী হল শুনি।

বলে চেয়ারটা ঘুরিয়ে আমার মুখোমুখি বসল।

কথার ভিতর বেশ একটু গান্তী একে বললুম £ রাণাকে পছন্দ হয়?

খবাতিও তেমনি গম্ভীর হয়ে বলল £ মেয়েদের আবার পছন্দ কী! তোমাদের পছন্দেই আমার পছন্দ।

বললুম £ঃ মামা বলছিলেন যে অমন ভাল ছেলে_নাঁকি তিনি আজও পর্যন্ত দেখেন নি। যেমন রূপ, তেমনি গুণ। আর এইটুকু বয়সেই অত বড় অফিসের ভেতর আলাদা ঘর পেয়েছে এক দিন হয়তো! গোটা অফিসটারই মালিক হস্ম বসবে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার বল তো!

সেদিন এই কথার একট বিশেষ অর্থ ছিলি মিত্রা আমার পরিচয় চায় নি, কিন্তু তার দৃষ্টিতে সেই কৌতৃহল দেখেছিলুম তাই নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছিলুম - নির্বঞ্কাট মানুষ, আপনার বলতে ছুনিয়ায় কেউ কোথাও নেই থাকবার মধ্যে উতোরপাড়ায় একখান! ভাড়াটে ঘর আছে, আছে নটা কুডির লোকাল ট্রেন, আর ডালহৌসি স্কোয়ারে আছে সারি সারি টেবলের 'ভেতর একখানা কাঠের চেয়ার

আমার কথা শুনে অট্রহাস্ত করেছিল রাণা, আর মিত্রার তীক্ষু দৃষ্টিতে আরও একটু ধার দেখেছিলুম যেন। কিন্তু পরের দিন স্বাতি আমাকে ভৎসনার সুরে বলেছিল ; তোমার কি ইজ্জৎ জ্ঞান কোন দিন হবে না গোপালদ! ! কাল নিজের পরিচয়টা অমন ফলাও করে দেবার কী দরকার ছিল!

দরকার ছিল না মানি। কিন্ত সেদিন এটুকুই তো। আমার অহংকার ছিল

কিন্তু রাণার সম্বন্ধে আমার মন্তব্য সে সহজ ভাবেই নিল। বললঃ বিলেত-টিলেত তো ঘুরেই এসেছে কিছুই বিচিত্র নয়। কিন্তমা কী বলছিলেন জানো? বলছিলেন, ভাগ্য তোর গোপালদার। অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা পেল রাতারাতি মিত্রাদিকে পছন্দ হয়েছে তা গোপালদ ?

অর্ধেক চোখ বুজে বললুম £ আহা !

স্বাতি.সশক্ে হেসে উঠল, আর আমিও যোগ দিলুম সেই হাসিতে তার পরেই তার বিষগ্ন মুখ দেখে বললুম কাঁ হল ?

জ্বানশঙ্করবাবুর পোস্পুত্র হতে তুমি রাজী হয়ে গেছ গোপালদা ?

স্বাতির প্রশ্নে আঁমি বেদনার আভাস পেলুম। সত্যি কথা লুকোবার ইচ্ছা আমার ছিল না বললুম : রাজী না হয়ে উপায় কী বল! ইজ্ডণবিরুদ্ধে আমায় রাজী হতে হয়েছে।

গল্পটা কী ভাবে শুরু করব ভাবছিলুম। স্বাতি বলল বাজিতে আমি হেরে গেছি। বাবা যখন চিঠি লিখছিলেন তোমাকে, আমি জোর গলায় বলেছিলাম যে এমন প্রস্তাবে গোপালদা কিছুতেই রাজী হবে না। বাবা বিশ্বাস করেন নি আমার কথা বলেছিলেন যে অর্থের একট! মোহ আছে সেই মোহ যার নেই, সে অতি-মান্ুষ। তেমন মানুষ দুনিয়ায় আজ বিরল। তবু আমি জোর দিয়ে বলেছিলাম, গোঁপালদা কিছুতেই রাজী হবে না।

স্বাতি চুপ করল, আমিও আর কথা খুজে পেলুম না মনে হল, ম্বাতিই শুধু হেরে যায় নি, আমিও হেরে গেছি। বিত্বের যুপকাঠে নিজের আদর্শকে বলি দিয়ে আমি শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছি। আমার নূতন ভাগ্যোদয়ে আর যারাই করতালি দিক, আমি এই মেয়েটির কাছে অপদার্থ প্রতিপন্ন হয়েছি নিশ্চিত রূপে

এমন, যে হবে, আমি তা ভাবতে পারি নি। যখন রাজী হয়েছিলুম, তখন কি নিজের স্বার্থের কথা ভেবেছি ! মনে পড়ে না। হয়তো ভেবেছি তাতে আপত্তির কিছু ছিল না। ছুনিয়াটা আজ চাদির পিছনে ছুটেছে। ধর্ম মোক্ষ সম্মান প্রতিষ্ঠা সবই আজ টাদির খেলায়। কিন্তু টাদি পেয়ে যে চাদ হারাতে হবে, তাকি সেদিন ভেবেছিলুম! তাই গভীর ভাবে বললুম £ তুমিও আমায় ভুল বুঝলে স্বাতি ?

স্বাতি সে কথার উত্তর দিল না বলল £ বাবা তোমাকে সবই দিতে পারতেন | দিতেনও। প্রত্যাখ্যান করে তুমি যে ধাক্া দিয়েছিলে, তাতে আমরা যুগ্ধ হয়েছিলাম তোমার মর্ধাদাজ্ঞোন দেখে বাবা বিষয়ী লোক, খানিকট। সন্দেহ করেছিলেন তোমার আচরণে বলেছিলেন, আমার কাছে মাথা নোয়াল না, নোয়াবে পরের কাছে। জগতের রীতিই এই যত আপন, গার সঙ্গে তত লুকোচুরি সংসারের অভাব অভিযোগ ছুনিয়ার লোকে দেখে সব, তাতে বাধা নেই, আত্মীয় বন্ধতে দেখলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়। তোমাকে যখন এলাহাবাদে আসতে লিখেছিলেন, আমার মনে হয় যে বাকা বিশ্বাস করতেন তুমি তাদের পোস্পুত্র হতে রাজী হবে।

মনে মনে আমি কথা মেনে নিলুম। যত আপন, তত লুকোচুরি তার সঙ্গে ছুনিয়ার লোক কে কী ভাবছে, তা গ্রান্ত করি না। আমি মরে যাচ্ছি স্বাতি কী ভেবেছে তাই মনে, করে আজ এই মুহুর্তে স্বাতির কাছে যদি সত্য কথাটা গোপন রাখতে পারতুম, তাহলে চিঠি লিখে জ্ঞানশঙ্করবাবূুকি আমার মতের পরিবর্তন জানিয়ে দিতে একটুও দ্বিধা হত না। কিন্তু হাতের যে টিল বেরিয়ে গেছে তাকে আর ফিরিয়ে আনার উপায় নেই।

অনেকক্ষণ চেষ্টা করে অনেক সঙ্কোচ নিয়ে বললুম £ কেন রাজী হতে হয়েছে সে কথা যদি শোন--

বাধ! দিয়ে স্বাতি বলল : সেকথা কি আজ অবান্তর নয় গোপালদ। ?

আর

কৈফিয়ৎ! তোমার কাছে কৈফিয়ৎ চাইবার আমার কোন্‌ অধিকার !

স্বাতির শুকনো হাসিতে আমি কান্নার মতো! অভিমান দেখলুম। বললুম £ অধিকার দানের জিনিস নয় স্বাতি, অধিকার জবরদস্তি দখলের জিনিস। ইচ্ছে করে কেউ অধিকার ছেড়ে দেয় না,

অতক্কিতে আক্রমণ করে অধিকার কেড়ে নিতে হয়। অধিকারের লোভ থাকলে জোর খাটাতেই হবে।

স্বাতি তখনই আমার জবাব দিল লোভ আর কিসের রইল গোপালদা ?

সত্যি কথা এর পরে আমার আর বলার কিছু নেই

অনেকক্ষণ পরে ম্বাতি আবার কথা কইল বলল £ তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম ইউনিভান্সিটির কন্ভোকেশনে। গোড়ার দিকে তুমি এম, এর ডিগ্রী নিলে তখন তোমাকে চিনতাম না, কিস্ত ভুলতেও তোমাকে পারি নি। তোমার ভঙ্গিতে একট! দৃঢ়তা ছিল, একটা সৌম্য ব্যক্তিত্বের ছাপ, যা আর কারও ভেতর দেখি নি। দ্বিতীয় দিন তোমাকে দেখলাম আমাদের দোতলার বারান্দা থেকে বাবার সঙ্গে দেখা করে তুমি ফিরে গেলে সেদিন বাবার কাছেই তোমার পরিচয় পেলাম। আজ নুকোব না! গোপালদা, তোমার ঠিকানা জানলে আমি নিজেই তোমার কাছে যেতাম আমাকে বেহায়া ভাবলেও আমি বলে আসতাম যে তোমাকে আমি শ্রদ্ধা করি। তোমার রূপ নয়, তোমার বিদ্যাও নয়, শ্রদ্ধা করি তোমার মধাদাবোধকে |

একটু থেমে বলল £ এই মধাদাবোধ আজ তুমি টাকার মোহে খোয়ালে গোপালদা ?

আমি কোন উত্তর দিতে পারলুম না।

স্বাতি একট! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ; তৃতীয়বার তোমার দেখা পেলাম হাওড়া স্টেশনের ভিড়ের ভেতর রাম খেলাওন হারিয়ে গেছে। সঙ্গে একজন লোক না নিয়ে কন্তাকুমারীর পথে পাড়ি দেবার সাহস বাবার ছিল না। তার অন্ুরোধে তুমি রাজী হও নি, মার কথাতেও না। কেন হয়েছিলে, আমি তা অনুমান করতে পারি। সেদিনই তোমার মনের খানিকটা পরিচয় আমি পেয়ে- ছিলাম। তার পর-_

তাঁর পরের ঘটনা! আমার জানা কয়েকটা দিন এক সঙ্গে ঘুরে তারা 'যেমন আমায় চিনেছিলেন, আমিও চিনেছি তাদের। স্বাতিকে চিনতেও আমার ভুল হয় নি। নিজের অস্বাবধানতায় একটু হিসেবের ভূল হয়ে গেছে একটু, না মারাত্মক !

তার পরের ঘটন! কি তুমি হঠাৎ ভূলে গেলে গোপালদা ?

বড় ককণ শোনাল স্বাতির প্রশ্নটা কোন রকমে বললুম ভুলে গেলে কি আজ এইখানে এমন করে তোমাব্‌ কাছে ছুটে আসতৃম !

গল্প শুনতে এসেছ, আব গল্প বলতে তাৰ বেশি কিছুর সম্ভাবনা তো! শেষ হয়ে গেছে আরকি তোমাকে আমরা শ্রদ্ধা করতে পাবব ?

ধনীকে কি শ্রদ্ধা করা যায় না?

ধার কব! ধনীকে যায় না। চাদ আমরা ভালবাছ্ি কিন্ত প্রণাম করি সূর্যকে

বললুম : আজ তোমাকে বড় রোমান্টিক মনে হচ্ছে

স্বাতি বললঃ ঠিক উল্টো আমি আর রোমান্টিক হতে পারছি নে।

দিল্লীতে আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে বসে আমি পুরনো দিনের কথা ভাবছি। ছুজনেরই শরীরের উপর দিয়ে সারা দিন অনেক ধকল গেছে। শ্রান্ত দেহে ফিরে এসেছি হোটেলে সম্বাতি স্নান করতে গেছে, আর আমি ভাবছি-_

কী ভাবছ বল তো?

পিছন থেকে স্বাতির প্রশ্র শুনে আমি চমকে উঠলুম আশ্চয হয়ে গেলুম তার দিকে চেয়ে। কৌতুকের হাসি তার ঠোটে বলল £ মাথায় বাজ পড়েছে বুঝি ?

কিসের জন্যে !

মুখ দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।

১০

গম্ভীর মুখে বললুম সত্যিই একটা সমস্যায় পড়েছি, স্বাতি বলল : আশ্চর্য তো! ভ্রমণে এমন ভয় ঢুকেছে মনে ! না না, সে কথা আমি ভাবছিই না। তবে ? বললুম £ অনেক দিন আগের একটা কথা মনে পড়েছে এই দিল্লীতেই তুমি আমাকে বলেছিলে, আর কোন দিন আমাকে শ্রদ্ধা করতে পারব না।

স্বাতি হেসে বলল £ সব কথা এখনও তোমার মনে আছে!

সত্যি কথা বলেই মনে আছে মিথ্যে কথা তৈরি করে লিখলে আনেক দিন আগেই ভুলে যেতুম !

স্বাতি খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলল তখন খুব সেন্টিমেন্টাল ছিলাম

কিন্তু আমি যখন এই কথা বলেছিলুম, তখন তুমি কী বলেছিলে মনে আছে?

আছে বলেছিলাম, সেন্টিমেপ্টস্‌ আছে বলেই তো আমরা মানুষ

আর আমি বলেছিলুমু, তো ছবলতা, বুদ্ধি দিয়ে ওকে জয় করতে হয়।

স্বাতি বলল ; আমার উত্তরটাও মনে আছে। বলেছিলাম, বুল, বিষ দিয়ে হত্যা করতে হয় হৃদয়কে আর তুমি আমার এই অভিযোগের উত্তর দিতে পার নি।

আমি বললুম £ সেদিন বাইরের বাতাসে ছিল উত্তাপ। আর ঘরের ভিতরটাও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বলে আমার মনে হয়েছিল

স্বাতি বলল £ আজ হঠাৎ সব কথ! কেন ভাবতে বসেছ ?

ভাবতে বসেছিলুম অন্য কথা কাল সকালবেলায় কোথায় যাওয়া যায় তাই ভাবতে গিয়েই এই সব কথা মনে পড়ে গেল

এখন কি খুব ক্লাস্ত বোধ করছ?

১০

কেন বল তো?

একবার কালীবাড়ি যেতে ইচ্ছে হচ্জে।

হেসে প্রশ্ন করলুম £ কোন মানৎ আছে নাকি ? থাকলে কাল ভোর বেলায় যাওয়াই তো ভাল.।

স্বাতি তখনই আমার কথা মেনে নিয়ে ধলল £ ঠিক বলেছ। কাল সকালেই বেরোব

- 808

স্বাতি বলল ; তৃমি এই চেয়ারটায় আরাম করে বোসো, আমি বসছি এইখেনে। বলে আমাকে একখানা চেয়ারে বসিয়ে নিজে আমার চেয়ারটায় বসল। বললঃ তোমার নতুন বইএর কী নাম হবেজানো?

না।

মরুভারত।

তারপরেই প্রশ্ন করল ; নামটা ভাল নয়?

বললুম £ ভারতের মরুভূমির কথা লিখতে হলে এই রকম নামই উপযুক্ত হবে। কিন্তু নামটি এর আগে শুনেছি বলে মনে হচ্ছে।

স্বাতি বলল: ঠিকই মনে হচ্ছে। এই তো একটু আগে বালুরামবাবূই বলছিলেন, মরুভারতের মানুষ অজ্ঞাত উপেক্ষিত মানুষ

কিন্তু মরুভূমি তো রাজস্থানের! রাজস্থানের কথা যে লেখা হয়ে গেছে!

মে তো টুরিস্টের রাজস্থান ! জয়পুর আজমীর পুষ্কর চিতোরগড় উদয়পুর আর আবু পাহাড় নিয়ে এই রাজস্থান। আমরা এই রাজস্থানই দেখি, পড়ি এই রাজস্থানের কথা এর বাইরেও যে রাজস্থান আছে, জা দেখবার বা জানবার চেষ্টা সত্যিই আমরা করি না।

বললুম £ কিন্তু বিকানের যোধপুর বা জয়ললমেরের নাম শুনেছি।

কিছু দেখেছ কি সেখানকার ?

না।

১৩

আরব সাগরের তীরে কচ্ছ নামে একটা অঞ্চল আছে তান সন্বন্ধে কিছু জানো?

তাও জানি না।

তবে এই দেশের সব দেখেছ বলে দাবী করা তোমার উচিত নয়।

বললুম £ রকম দাবী তো কখনও করি নি।

স্বাতি বলল £ তুমি থেমে গেলে অনেকেই তা ভাববে মনে করবে, এর পরে দেশে আর কোন দ্রষ্টব্য নই

হেসে বললুমু £ তোমার কথা তো আমি মেনে নিয়েছে !

মুখে মেনে নিয়েছ, কিন্ত মনে উৎসাহ দেখছি না কেন?

কে বলল উৎসাহ নেই ?

কথা কি আমায় অন্টের কাছে জানতে হবে?

বলে স্বাতি গভীর দৃষ্টিতে তাকাল আমার মুখের দিকে

এইবারে আমার উদ্বেগের কথা বললুম £ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে- ছিলুম দিল্লী আসব বলে"। ভারতের শেষ প্রান্তে যাবার জন্তে তৈরি হয়ে তো বেরোই নি !

স্বাতি হেসে উঠল উচ্ছল ভাবে বলল ; রকম কথা তো আগে কখনও ভাবতে না!

একটু অপ্রস্তুত ভাবে বললুম £ কেন ভাবছি, তা বুঝতেই পারছ

ভাবনা তোমার নয়, কোন দিন তোমাকে ভাবতেও দেব না। তুমি তোমার মনটাকে তৈরি কর, বাকি সব ভার আমার বালুরামবাবুকে নিয়ে আমি সব ব্যবস্থা করব।

তার পরেই প্রশ্ন করল : কদিন সময় লাগবে বল তো ?

বললুম £ হিসেব কর। কালকের দিনটা আমাদের দিল্লীতেই কাটবে। তার পরের তিনটে দিন বিকানের যোধপুর জয়সলমেরে |

তার পর?

১৪

কচ্ছে পৌছতে একটা দিন লেগে যাবে, আর গোটা অঞ্চলটা দেখতে ছুদিন। তার পর কলকাতায় ফিরতে দিন ভ্িনেক সময় নিশ্চয়ই লাগবে

স্বাতি বলল £ তাহলে দিন দশেক সময়ের দরকার

বললুম £ ছু-চারদ্রিন হাতে রেখে ছু সপ্তাহ ধর।

খরচ ?

দিনে দুজনের পঞ্চাশ টাকা লাগবে বলে মনে হয় না।

তার মান সাতশো টাকা

তার পরে রেল ভাড়া।

স্বাতি বলল ; দিল্লী থেকে ফেরার টিকিট তো আছে, কচ্ছে যাতায়াতে কত লাগতে পারে মনে হয় ?

বললুম £ একেবারে আন্দাজে বলব ?

বল।

সেকেওু ক্লাসে তিনেক টাকার বেশি লাগবে না।

খুশী হয়ে স্বাতি বলল £ একটু বুঝিয়ে বল তো!

বললুম 2 যাতায়াতে ছু হাজার মাইল হতে পারে তার ভাড়া ছ্জনের আড়াইশে। টাকার মতো

স্বাতি উজ্জ্বল চোখে বলে উঠল 2 তবে কোন ভাবনা নেই

চাকরির কী হবে?

ছুখান৷ টেলিগ্রাম

বলে সে উঠতে যাচ্ছিল। দরজায় কেউ টোকা দিচ্ছে দেখে সেই দিকেই এগিয়ে চোল।

দরজা খুলতেই ব্যস্তসমস্ত ভাবে ঢুকে পড়ল বালুরাম। হাসিমুখে সে বলল যাত্রা আমাদের শুভ হবে।

কেন?

বলে স্বাতি তার মুখের দিকে তাকাল।

বালুরাম বলল £ এই নিন বিকানেরের টিকিট। কাল রাতের

১৫

গাড়িতেই জায়গা! পাওয়া গেছে। নট1 পনের মিনিটে ছাড়াবে, আর পৌছাব সকাল আটটা পঞ্চাননয়। দিনের গাড়িতেও যাওয়া যেত কিন্তু এগার-বারো ঘণ্টা জানির পরে কোন এনাজি অবশিষ্ট থাকত না। দিকে দিল্লীতে রাজস্থান সম্বন্ধে কিছু লিটারেচার সংগ্রহেরও সময় পাওয়া গেল।

স্বাতি বলল বিকানের এখান খেকে কত দূরে ?

পাঁচশো পয়ষটি কিলোমিটার

টিকিটেত্র উপরে ভাড়াটা ম্বাতি দেখে নিল। তার পরে নিজের ব্যাগ থেকে ভাড়ার টাকাটা বার করে এগিয়ে দিল বালুরামের হাতে।

বালুরাম বলল : বিকানের থেকেই আমরা জয়সলমের যাব যোধপুরের ওপর দিয়ে। তার পর মারবাড় জংসন আবুরোড পালনপুর হয়ে গান্ধী ধাম। ইচ্ছে করলে কচ্ছের প্রধান শহর ভুজ পর্যন্ত ট্রেনেই ঘুরে আসতে পারবেন

একটু থেমে বলল £ মরুভূমিতে বার্মের নামে আর একটি শহর আছে। যোধপুর থেকে ট্রেনে যেতে হয়। সময় থাকলে সেখানেও যেতে পারবেন।

পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে জায়গার নাম আমি শুনেছি। এই মরুভূমির উপর দিয়েই পাকিস্তানের সীমান্ত।

স্বাতি তার চেয়ারখানা এগিয়ে দিয়ে বলল বসুন

বালুরাম ধন্যবাদ দিয়ে বলল £ না, এখন আর বসব না। অনেক কাজ আছে আমার

কিন্ত আমাদেরও যে আপনার সঙ্গে কাজ আছে!

আমার সঙ্গে!

বালুরাম ঝুপ করে চেয়ারে বসে বলল; তবে তো বসতেই

হবে। স্বাতি হেসে বলল £ চ। খাবেন, না কফি?

১৬

না না, চা ককি আমি খাই নে।

তবে কি ছুধ খাবেন ?

বালুরাম লজ্জিত ভাবে বলল: ছুধ খাবার সময় এখন নয়। আপনি কাজের কথা বলুন

স্বাতি বললঃ অপনি তো যোধপুরে কাজ করেন শুনেছি, আমাদের জন্যে বিকানেরে যাবেন কেন?

বালুরামূ লজ্জিত ভাবে বলল ঠিক আপনাদের জন্তেই যাচ্ছি না। আমারও কাজ আছে। মানে__

স্বাতি বলল 2 লজ্ঞ। পাচ্ছেন কেন?

না, মানে

আপনি কি বিবাহিত ?

না।

তবে বলুন না, কোন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন ?

হা, তা

স্বাতি হেসে বলল বিয়ের আগে বন্ধু বলাই ভাল বিদেশে তো বয়ফেণ্ড আর গার্লফেণ্ড কথা খুবই প্রচলিত। বন্ধুর মতো স্থন্দর সম্বন্ধ আর কী আছে বলুন!

আমি এতক্ষণ নীরবেই ছিলুম। এইবারে বললুম £ আমরা ছুই বন্ধু সারা ভারতবর্ষটা দেখেছি আপনার মতো লজ্জা পাই নি কোন দিন।

বালুরাম এবারে আমার দিকে ফিরে বলল £ সত্যি নাকি!

বললুম £ আমরা* বেপরোয়া ছিলুম। মনে যখন পাপ নেই, তখন কে কী ভাবল তার তোয়াক্কা রাখি নি।

স্বাতি প্রতিবাদ করে বলল তুমি কথা বোলো না। মার ভয়ে তুমি সারাক্ষণ কেঁচো হয়ে থাকতে !

ভয়ে নয়-_

বুঝেছি ভাল ছেলে সাজবার ভান করতে।

১৭ মরুওরত পর্ব-২

তার পরে বালুরামকে বলল £ আপনাদের সম্পর্কটা খুব সহজ করে ফেলুন'। প্রথমে আমাদের সামনে, তার পরে সবার সামনে বন্ধুর সম্পর্কটা! যে কত মধুর তখন তা বুঝতে পারবেন

বালুরাম বলল £ ঠিক বলেছেন। অকারণে আমরা আড়ষ্ট য়ে থাকি। স্বাতি বলল £ তাহলে এই কথাই র্টল। আজ থেকে আমাদের সামনে কিছু গোপন করবার দরকার নেই আমত্রা সবাই বন্ধু।

বালুরাম -একটু দ্বিধা করে বলল £ ব্যাপারে আমরা খুব পিছিয়ে আছি। বিয়ের আগে বন্ধৃতা! আমরা যেন ভাবতেই পারি না বিয়ের পরেও আমাদের অনেক লুকোচুরি |

স্বাতি বলল : দিল্লীতে তো আমি রকম দেখি নি!

বালুরাম বলল £ দিলী তো রাজস্থানের বাইরে কিন্তু দিল্লীতেও সব পরিবারে রকম দেখবেন না। তাই এটা ব্যতিক্রম

উঠবার জন্তে বালুরাম ছটফট করছিল। বলল £ আজ উঠি! কাল এক সময়ে এসে কিছু টুরিস্ট লিটারেচার দিয়ে যাব

খুব ভাল কথা

বলে স্বাতি ভদ্রলোককে দরজার বাহিরে পৌছে দিল। ফিরে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করল £ ভদ্রলোক বোধহয় মারোয়াড়ী, তাই না?

বললুম £ মারবাড়ী কিনা জানি না, তবে রাজস্থানী নিশ্চয়ই |

মারোয়াড়ী আর রাজস্থানীতে কোন তফাত আছে নাকি ?

আছে বৈকি। রাজপুতানায় মারবাড় *নামের একটি রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের অধিবাসীকেই বল! হয় মারোয়াড়ী বা মারবাড়ী, কলকাতায় অবশ্য রাজস্থানের সব ব্যবসায়ীকেই মারোয়াডী বলে।

বাতি বলল রাজস্থান তো রাজ্যের নতুন নাম, আগে বোধ হয় রাজপুতানা বলত। রাজপুতের দেশ রাজপুতানা। কিন্তু এই

১৮

রাজপুত কার? বড়বাজারে ব্যবসা করছে যারা, তাদের তো! রাজপুত বলে না!

রাজপুতের ক্ষত্রিয় বলে গণ্য হয়।

গণ্য হয় বলছ কেন? সেবারে তো বলেছিলে, দেশের রাজা মহারাজারা সব সূর্য চন্দ্রবংশের ক্ষত্রিয়।

বললুম £ তারা তাই দাবী করেন।

তাহলে'আসলে কী?

রাজস্থানের বিখ্যাত এতিহাসিক টড সাহেব কী মনে করেন তাই বলি। গান্ধারের শক জাতিই রাজস্থানে এসে রাজপুত নামে পরিচিত হয়েছে।

স্বাতি বলল £ ইতিহাসে আমরা শক হুন পারদ কুষান এই সব নাম পড়েছি কিন্তু এরা কার! তা জানি নে।

বললুম £ এখনকার ইতিহাসের আগেও আমাদের দেশে এক ধরনের ইতিহাস প্রচলিত ছিল, তার নাম পুরাণ। রামায়ণ মহাভারতও আমরা প্রাচীন ইতিহাস বলে মানি। তাতে আমাদের ভারতবর্ষের নাম জন্বদ্বীপ, আর তার উত্তরে শকদ্বীপ। দ্বীপের সংজ্ঞা তখন এখনকার মতো! ছিল না ছৃদিকে জল থাকলেই দ্বীপ বলত। জনুদ্ীপ শকদ্বীপের মাঝখানে পামীর তারই সংলগ্ন ছুর্গম পবতমাল! তু স্থান পর্যস্ত বিস্তৃত। এই ছুই দেশের মধ্যে যাতায়াত সে যুগে ছুঃসাধ্য ছিল। তাই শকদীপের সম্বন্ধে নানা রকমের কাহিনী প্রচলিত ছিল এই দেশে আর শুনে আশ্চষ হবে, অনেকের মতে মধ্যএশিয়ার এই পামীর পাহাড় আমাদের পুরাণের মেরুপবত বা সুমেরুর দক্ষিণাংশ আর এই পর্বত শিখরেই ছিল দেবতাদের বাস।

স্বাতির দৃষ্টিতে গভীর বিস্ময় ফুটে উঠল। তাই দেখে বললুম : পুরাণের কথ! না মানলেও গ্রীক এঁতিহাসিক হিরোভোটাসের মত বোধহয় অনেকেই মেনে নেবে তিনি লিখেছেন যে হিন্দুস্থান

৯৪

ক্ষিদিয়ার মধ্যে হিমদেশ নামে এক পাহাড়ের ব্যবধান। গ্রীকরাও বিশ্বাস করে যে এই, হিমদেশেই ছিল দেবতাদের বাস

কতকটা অবিশ্বাসের সরে স্বাতি বলল £ সব তোমার নিজের কথা নয় তো?

বললুম তৈরি করে বলতে পারি, এমন ক্ষমতা আমার নেই। এক সময়ে বই নিয়েই আমার সময় কাটত। ছূর্গাদাস লাহিড়ীর পৃথিবীর 'ইতিহান থেকে নগেন্দ্রনাথ বন্ুর বিশ্বকোষ" পর্যন্ত বাদ দিই নি। সব কথা তো মনে নেই, যতটুকু মনে আছে ততটুকুই বলি।

স্বাতি বলল : দেবতাদের বাসস্থান সম্বন্ধে আর কিছু মনে নেই?

বললুম £ আমাদের আলোচনা থেকে তাহলে দূরে সরে যেতে হবে।

সংক্ষেপে বল।

বলে স্বাতি সাগ্রহে আমার মুখের দিকে তাকাল

বলনুম অমরকোষ বা শব্দরত্বাবলীর মতো প্রাচীন বইএ ইন্্রালয় নামে একটি জায়গার উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার জনস্টন সাহেবের এশিয়ার মানচিত্রেও আছে এক ইন্দরালয়। এই জায়গাটি হিন্দুকুশ পাহাড়ের উপরে কাশ্মীর পেরিয়ে। বেদ পড়ে জানা যায় যে মূল ইন্দ্রালয় অত্যন্ত হিমপ্রধান দেশ ছিল। তাই দেবতাদের প্রায় ছশো ক্রোশ দক্ষিণে নতুন ইন্দরালয়ে এসে বসতি স্থাপন করতে হয়।

স্বাতি বললঃ তুমি কি বলতে চাও পামীর পাহাড়েই ছিল প্রথম ইন্দ্রালয়। আর সেখান থেকেই দেবতারা এসেছিলেন হিন্দুকুশ পাহাড়ের উত্তরে ? , ধ্ধেদে এই রকমের কথা আছে। ধান দেশের লোকের মতো শীতের দেশ থেকেই তারা

ভীরতবর্ষে এসেছিল। কথাও জানা যায় যে উত্তর কুরু, উত্তর মদ্র, কান্থোজ বাহলীক-_এ সব দেশ ইন্দ্রালয়ের কাছেই ছ্িল। চেষ্টা! করলে সে যুগের একটা মানচিত্র তৈরি করা খুক অসম্ভব কাজ নয়।

স্বাতি বলল £ সে চেষ্টা করবে তো?

হেসে বললুম £ (তামার কথা শুনে হাসি পাচ্ছে

কেন?

সেই ছড়াটা! মনে পড়ছে না। মানে, পণ্ডিতের গেলেন রসাতল, আর আমি বলব কত জল!

স্বাতি হাসল না, গম্ভীর ভাবেই বলল £ পণ্ডিতরা যদি কিছু ন! বলেন তে। একজনকে তো! বলতেই হবে।

সেই একজন কি আমি!

বাতি বলল ; এইবারে রাজপুতাদেব কথা বল।

বলছিলুম শকদের কথা, তাই না! টড সাহেবের মতে জিট বা জাট, তক্ষক অসি প্রভৃতি শকের৷ শ্রীষ্টের জন্মের ছশো বছর আগেই ভারতে এসেছিল তাঁর মানে বুদ্ধের জন্মের ঠিক আগে। কাজেই হিন্দুদের সংস্পর্শে এসে তারা হিন্দু ধর্কেই গ্রহণ করে, নিজেদের হিন্দু ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দেয়।

স্বাতি বললঃ বুদ্ধের জন্মের আগে পুথিবীতে আর অন্ত ধর্ম কোথায় ছিল!

বললুম সেইটেই আসল কথা কিন্ত আমাদের ইতিহাস বলে বাহলীক রাজ্যের গ্রীকদের পরে এসেছিল শকেরা। তার মানে, শ্রাষ্টের জন্মের আগের শতাব্দীতে এই যাযাবর জাতি অক্ষু নদীর তীরে বাস করত, ইউচি নামের আর একটি যাযাবর জাতির আন্রমণে নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে ভারতে চলে আসে উত্তরে তক্ষশীলা মথুরা এবং দক্ষিণে মালব সৌরাষ্ট্রে তারা ছড়িয়ে পড়ে। শক রাজার! নিজেদের ক্ষত্রপ বলতেন, আর মহাক্ষত্রপ রুদ্রদামন ছিলেন শ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম থ্রীষ্টাব্ের শেষ থেকে চতুর্থ শ্রীষ্টাব্ধের

২৯

শেষ পর্ধস্ত তিনশো বছর তারা সৌরাষ্ট্রে রাজত্ব করেন। শকদের পরে আনুস"পহুলব বা পারদরা। কাম্পিয়ান হৃদের দক্ষিণ থেকে কান্দাহার জয় করে "কাবুল সিম্ধুনদের উপত্যকায় তারা অনেক- গুলি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। সবার শেষে আসে কুষাণ নামে ইউচি জাতির একটি শাখা ভারতের একজন শ্রেষ্ঠ আট ছিলেন কুষাণ রাজ কণিক্ষ। তার কথা নিশ্যয়ই তোমার মনে আছে?

স্বাতি বলল বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক 1ইলেন তিনি

কিন্ত এদের. সঙ্গে রাজপুতের কোন সংস্রব নেই। মন্ুসংহিতার মতে ক্ষত্রিয় শকের! বৃষলত্ব প্রাপ্ত হয়েছিল

বুষলত্ব মানে কী?

শূদ্রত্। মানে পতিত হয়েছিল ব্রাহ্মণের অভাবে হরিবংশ ৰা কোন পুরাণে বোধহয় আছে যে হৈহয়রা সগরের পিতাকে হত্যা করেছিল। সগর এই হৈহয়দের বিনাশ করলে শকেরা বশিষ্টের আশ্রয় নেয়। বশি্ঠটের কথায় সগর এদের হত্যা না করে মাথা মুড়িয়ে ছেড়ে দেয়। এই পৌরাণিক কাহিনীর একটা তাৎপর্য আছে।

বল।

বলে স্বাতি আমার মুখের দিকে তাকাল

বললুম £ ভারতে আসার আগে শকেরা সূর্যের উপাসক ছিল। প্রাচীন শক মুদ্রা দেখেই কথা মেনে নিতে হয়। কেননা এই সব মুদ্রায় স্ূর্ধের উপাসনা অগ্রিবেদীর চিত্র আছে। ভারতে এদের বংশধরেরা তাই সূর্যবংশীয় অগ্নিকুলোদ্বে বলে পরিচয় দেয়। আবু পাহাড়ে বশিষ্ঠের হোমের আগুনে তাদের জন্ম

স্বাতি বলল : সেবারে রাজস্থানে এই গল্প শুনেছিলাম

বললুম কিন্তু এতক্ষণ যা বললুম, তা সবই পণ্ডিতদের কচকচি। রাজপুতর! মানে না যে তারা কোনকালে শক ছিল। আবার টড সাহেবও নাছোড়বান্দা রাজপুতদের উৎসব রীতি

নীতি আচার ব্যবহার থেকে প্রমাণ করে ছেড়েছেন যে সে সবে শক প্রভাব এখনও আছে।

স্বাতি হেসে বলল ; আর প্রমাণ দিতে হবে না। তোমার কথা আমি মেনে নিচ্ছি

কিন্ত রাজপুতেরা €তা৷ মানে না! রাজস্থানের রাজাদের বড় বড বংশ পর্রিচয় আছে। রাজস্থানের চারণের! গান গেয়ে গেয়ে সেই সব বংশ পরিচয় শুনিয়েছিল টড সাহেবকে কিন্তু সে ভদ্রলোক বিনা বিচারে কিছু মেনে নেন নি। তার নিজের মতটা লিখে রেখে গেছেন তার বিরাট গ্রন্থ রাজস্থানে। সে এক অদ্ভুত কীতি। গান শুনে একটা জাতির ইতিহাস রচনার কথা আর কোথাও শুনি নি।

নিঃশবে স্বাতি আমার কথা মেনে নিল

77

দরজার উপরে করাঘাতের শবে আমার ঘুম ভেডে গেল। ধড়মড় করে উঠেই দেখতে পেলুম যে স্বাতি আমার আগেই জেগেছে ; কিন্তু দরজী খোলে নি। বিধানার উপরেই বসে আছে পা ঝুলিয়ে। আমাকে জেগে উঠতে দেখে বলল : না, তুমি দরজা খুলবে না।

জানলার দিকে চেয়ে বুঝতে পারলুম না, ভোর হয়েছে কিনা স্বাতি উঠে দাঁড়িয়ে বলল ঘড়ি দেখেছি-_পাচটা বেজে গেছে, কিন্তু সূর্য ওঠার সময় হয় নি।

বলে ঘরের বাতি জ্বেলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

বললুম £ তুমি পিছিয়ে এসো, দরজা আমি খুলে দিচ্ছি

বলে এগিয়ে যাবার আগেই স্বাতি দরজা খুলে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে ঢুকে দরজাটা যে বন্ধ করে দিল, তাকে চিনতে আমার একট্ুও সময় লাগল না। এবং সহসা একটা অপরাধ- বোধে মন আমার আচ্চন্ন হয়ে গেল। আমি তাকে স্বাগত জানাতে পারলুম না।

স্বাতি উচ্ফ্সিত ভাবে বলে উঠল £ একা কেন?

দেখিয়ে দোস্ড__

বলে একখান। চেয়ার টেনে নিয়ে চাওলা বসে পড়ল।,

মিত্রাকে সঙ্গে আনো নি কেন, কথা আমি বলতে পারলুম না। তাদের তো আমরা কোন খবর দিই নি, তাদের খবর দেবাব কথা আমাদের মনেই হয়নি। অথচ তাদের কাছে আমার অপরিসীম খণ। সে খণ আমি কোন দিন শোধ করতে পারব ন|। তাই আমি বলে উঠলুম £ ওকে দোষ দিও না, দোষ আমার। খবর না দেবার জন্য সাজা আমাকে দাও।

১৪

চাওলা] বলল £ ঠিক হ্যায়। আমি বিচারক আমি তোমাকে সাজা দিচ্ভি। তার আগে একটি ছোট্ট সওয়ালের জবাব দাও তো!

বল।

সকালের দিল্লী মৌলেই ফিরছ না তো?

না।

ব্যস, সব ঠিক হ্যায়

স্বতি আশ্চধ হয়ে বলল £ আর কিছু জানবার নেই ?

সে সব জানবার অনেক সময় পাওয়া যাবে।

বলে আমাকে বলল £ দোস্ত, চট্‌ করে মুখ হাত ধুয়েই বেরিয়ে পড়। ঠিকানা! মনে আছে তো? হাউজ খাস-_এই নাও কার্ড।

বলেই উঠে পড়ল।

আমি তার হাত টেনে ধরে বললুম £ উঠছু কেন?

কী মুস্কিল! বসবার আমার সময় কোথায়? ছুধ আনতে বেরিয়েছি, ফিরতে দেরি হলে অনেক মিথ্যে বলতে হবে।

তার পরেই দরজার দিকে চেয়ে বলল £ তোমাদের মনিং টী এসে গেলে এক কাপ খেয়ে যেতে পারতাম

স্বাতি ব্যস্ত হয়ে বলল £ আমি দেখছি

চাওলা তার পথ আগলে বলল: আপনি দেখবেন কী! বেয়ারাকে তো আমি জাগিয়ে এসেছি, পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছি তাকে

ঘড়ির দিকে চেয়ে বলল £ দশ মিনিট হয়ে গেল! এক একটা মিনিটের জন্তে আমাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে |

আমি হেসে বললুম £ তুমি দেখছি ঠিক আগের মতোই আছ, একটুও পরিবর্তন হয়নি তোমার

কী আশ্চয! মানুষের চরিত্র কি গায়ের জামা কাপড় যে ইচ্ছে করলেই পাল্টানো যায় !

তার পরেই স্বাতির দিকে চেয়ে বলল : মিত্রাকেও দেখবেন, এতদিন আমার সঙ্গে ঘর করেও সে ঠিক একরকম আছে।

দরজার উপরে একটা টোকা শুনে সে লাফিয়ে ঘরের বাইরে গেল। তার পরে বেয়ারার হাত থেকে চায়ের ট্রে নিয়ে স্বাতির হাতে এনে দিয়ে বলল £ আমার জন্যেও একট] কাপ দিয়েছে হ্যা, ভাল কথা, আমি যে তোমাদের কাছে এসেছি, যেন ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ না পায়।

স্বাতি সহান্তে বলল ; কেন বলুন তো !

চাওলা আতকে ওঠার ভাণ করে বলল £ ওরেববাবা-_

ঠিক বাঙালীর মতো উচ্চারণ করল চাওলা তাই দেখে স্বাতি আরও কৌতুক বোধ করে বলল : মিত্রাদি আমাদের ওপরে খুব রাগ করেছে বুঝি!

চাওলা বলল £ ছুটে মুখোস পরে যাবেন। কনট প্লেসের ধারটায় নানা রকম মুখোস পাওয়া যায়। ট্যাক্সি দাড় করিয়ে টুক করে কিনে নেবেন।

চা ঢালতে ঢালতে স্বাতি বলল £ আমাদের মুখ দেখবে না বুঝি !

জীবনেও না। আর তুল করে আমার কথা বলে ফেললে আমার মুখও আর দেখবে না। আপনারা তাকে যেমন দেখেছিলেন, ঠিক সেই রকম আছে।

স্বাতি তার দিকে প্রথম পেয়ালাটা এগিয়ে দিতেই সে তাতে একটা চুমুক দিয়ে বলল £ জিভটা পুড়ে যাবে, কিন্তু উপায় নেই

আমি হেসে বসলুম কিন্ত আমাদের খবর' পেলে কোথায়?

ভয় নেই, আমি স্বপ্নটপ্ন দেখি না, কোন মহাত্মাকেও চিনি না।

বলে দু-তিন বার চায়ে ফু' দিয়ে চাওলা চুমুক দেবার চেষ্টা করতে লাগল

গত বারে দিল্লী আসার কথ! মামার মনে পড়ে গেল। দিল্ী আমার কোন পরিকল্পনা আমার ছিল না। পৃজোর ছুটিতে বন্ধু

স৬

মনোরঞ্জনের সঙ্গে আমি হরিদ্বারে এসেছিলুম খষিকেশের পথে বাসে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন £ আপনাকে বড় অশান্ত দেখছি

আমাকে !

আমার এই প্রশ্ন "শুনেই তিনি হেসে বলেছিলেন ; এই প্রশ্ন করেই আপনি আমার সন্দেহট৷ সমর্থন করলেন।

_কাশীর দশীশ্বমেধ ঘাটেও আমাকে একজন এই রকমের কথা বলেছিলেন। আমি সেকথা বলতেই ভদ্রলোক উত্তর দিয়েছিলেন সাধারণ বেশে সেখানে অনেক মহাপুরুষ ঘুরে বেড়ান শুনেছি আপনি হয়তো তাদেরই কারও সাক্ষাৎ পেয়ে থাকবেন।

তার পরেই হেসে বলেছিলেন £ আমাকে যেন সে রকম কিছু ভাববেন না।

এর পরেও ভদ্রলোক অনেক কথা বলেছিলেন। কিন্তু গল্প আমি চাওলাকে বলি নি। আমি এর পরের ঘটন! তাকে মস্থুরিতে বলেছিলুম। গঙ্গার পরপারে গীতাভবনে আমি আবার তার দেখা পেয়েছিলুম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ; এইখান থেকে কি মন্থুরি যাবেন ?

আমি আশ্চর্য হয়ে বলেছিলুম £ কেন বলুন তো ?

আত্মীয় বন্ধু কেউ এখন আছেন না সেখানে ?

কেন জানি না, কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল যে তিনি আমাকে মন্তুরি যেতে বলছেন বলছেন, সেখানে কোন আত্মীয় বা বন্ধুর সাক্ষাৎ পাব। ধন্ধু মানেই তো স্বাতি। সে ছাড়া আর আমার আত্মীয় বা বন্ধু কে আছে!

কিন্তু মন্থুরি গিয়ে আমি ম্বাতির দেখা পাই নি, দেখা পেয়েছিলুম চাওলা মিত্রার। তারা রেজেস্রি করে বিবাহের পরে হানিমুনে এসেছিল আর আমার মুখে এই ঘটনা শুনে ছুজনেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। চাওলা বলেছিল : সত্যিই অবিশ্বীস্ত।

০৭

আর মিত্রা বলেছিল £ তাহলে আর একটু বলি। কাল ছুপুরে আমাদের “ফিরবার কথা ছিল। সময় মতে৷ বাস স্ট্যাণ্ডে গিয়েও জায়গা! পাই নি।

স্বাতি আমার দিকেও একটা পেয়াল৷ এগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমার খেয়াল ছিল না সে দিকে তাই দেখে চাওল! হা-হ1! করে হেসে উঠল বলল 2 মহাত্রার কথা 'দাস্তের মনে পড়ে গেছে।

তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে চায়ের পেয়ালাটা আমি নিয়ে নিলু চাওলা আরও কয়েকটা চুমুক দিয়ে চা শেষ করেই বলল £ আমার বেয়াদবি মাপ কোরো সবই তো বুঝতে পারছ

বলে বেরিয়ে যাবার আগে বলে গেল £ আটটার মধ্যে ভোমাদের এক্স পেক্ু করব আর-_

একবার ফিরে দাড়িয়ে বলল £ আমার সঙ্গে যে দেখা হয়েছে

বাধ! দিয়ে স্বাতি বলল ঘ্বুণাক্ষরেও বলব না।

চাওলা চলে যাবার পরে স্বাতি বলল £ আমার স্বপ্নের কথাও তুমি ওকে বলেছ নাকি ?

কোন্‌ স্বপ্লের কথা ?

মনে নেই ! সেবারে ওদের সঙ্গে মস্থুরি থেকে দিলী এসে তুমি আমাদের এক সাধুর গল্প বলেছিলে আর আমি তোমাকে আমার স্বপ্নের কথা বলেছিলাম

সে কথাও আমি ভুলি নি। চাগলারা চলে যাবার পরে স্বাতি আমাকে একান্তে ডেকে বলেছিল £ ভুমি যে আজ আসবে আমি জানতাম।

আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম £ কী করে?

বাতি বলেছিল £ রাতে স্বপ্ন দেখেছিলাম, স্থির জলে একখানা নৌকোয় আমরা ভেমে বেড়াচ্ছি। পাহাড়ে ঘেরা নীল জল, আর পর্দা ঝোলানো সুন্দর নৌকো

আমি আশ্চর্য হয়ে বলেছিলাম £ তে! কাশ্মীরের ছবি !

তা হবে।

তাতে আমি আজ আসছি, তা কী করে জানলে?

স্বাতি বলেছিল; আমার স্বপ্ন কখনও মিথ্যা হয় না।

তার! যে হিমাচল কাশ্মীর ভ্রমণের জন্যে তল্লি বেঁধে আমার অপেক্ষা করছিল, তা৷ তার বাবার কাছে শুনেছিলুম।

স্বাতি আমার উত্তরের অপেক্ষা কবছে দেখে বললুম £ তোমার কথা আমি কাউকে বলি নি। সেই সাধুব সব কথাও আমি কাউকে বলি নি।

আমাকে বলেছ তো?

মনে পড়ছে না।

স্বাতি আশ্চষ হয়ে বলল ; আগে তো তুমি কোন কথা তুলে যেতে না'

গম্ভীর হয়ে আমি বললুম দায়িত্ব এখন বেড়েছে তো!

তা দেখতেই পাচ্ছি। এইবারে বল।

বললুম সাধু বলেছিলেন, কিছুদিন পরেই আপনার মন স্থির হবে। আপনার প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সরে যাচ্ছে, আপনি সখী হবেন। তার পরেই বলেছিলেন, আমার অনুমানের কথা, আভক্ঞতার কথা আমি তো সাধু মহাপুরুষ নই, গণৎকারও নই। মানুষ দেখে কখনও এই রকম মনে হয়।

স্বাতি বলল না, কথা তুমি আমায় বল নি।

চাওলাদের বাড়ি খুঁজে বার করতে আমাদের কষ্ট হয় নি। আটটার মধ্যেই পৌছে গেলুম। একতলা বাড়ি। ছোট এক ফালি জমি আছে সামনে গোটা কয়েক গোলাপ গাছ আর কিছু মরম্থমি ফুল। চাওলার পরনে হাফ প্যান্ট, আর গায়ে হাতকাটা গেঞ্ি। রবারের নল দিয়ে গাছে জল দিচ্ছিল। আমাদের দেখতে পেয়ে ভূত দ্রেখার মতো চেঁচিয়ে উঠল. তার পরে আ-আ শব্দ করে বসে পড়ল ঘাসেরু উপরেই

২০)

চাওলার আর্তনাদ শুনে মিত্রা বেরিয়ে এল ছুটে আমাদের দেখতে পেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠল।

আমি চাওলার কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলুম ; কী হল দোস্ত? অমন করে বসে পড়লে কেন?

তার হাত থেকে রবারের পাইপটা খমে পড়েছিল। এইবারে আঙুল দিয়ে কপালের ঘাম মোছার ভ'ণ করে বলল: বপেয়। গিয়া

মানে?

বলে আমি মিত্রার দিকে তাকালুম

মিত্রা বলল : আস্মুন, আমি বলছি।

স্বাতিও কৌতুহলী হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল

মিত্রা বলল £ কাল বাজী ফেলেছিল আমার সঙ্গে হেরে গিয়েছে

আমি আশ্চয হলুম এহ কথা শুনে বললুম £ কিসেব বাজী ?

মিত্রা চাওলার দিকে চেয়ে বলল ; আপসোস কবে আর কী হবে! তার চেয়ে টাকাব কিছু খরচ করে-_

চাল! লাফিয়ে উঠে বলল ব্রেকফাস্ট ?

মিত্রা বলল £ শুধু ব্রেকফাস্ট নয়, লাঞ্চেরও ব্যবস্থা কবতে হবে।

চাওলা আর এক মুভুর্তও দেবি করল না। বাগানের এক ধাবে একটা স্কুটার দাড় করানো ছিল। খানিকক্ষণ পরেই দেখা গেল যে সে স্কুটারে চড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল

মিত্রা তার বাড়ির ভিতরে টেনে আনল *আমাদের। প্রথমেই আমাদের নজর পড়ল একটি দোলনার দিকে ফুটফুটে স্থুন্দব একটি শিশু ছুলছে। স্বাতি ছুটে গিয়ে কোলে তুলে নিল সেই শিশুকে, বলল £ তোমার ছেলে মিত্রাদি?

মিত্রা সগবে বলল £ ছেলে নয়, মেয়ে।

কিন্ত দেখতে তোমার মতো হয় নি তো!

৩)৫

তবে?

ঠিক বাপের মতো হয়েছে।

চাওলা সুপুরুষ তাই মিত্রা হুঃখিত হল না এই মন্তব্য শুনে ) আর স্বাতি বলল £ বাপের মতো দেখতে হলেই মেয়ে সুখী হয়।

মিত্রা বলল : মিজ্জেস ঘোষ বলছিলেন, পিতৃমুখী কন্তা সুখী

মিসেস ঘোষ কে?

তোমরা চিনবে না।

আমি বললুম আপনাদের বাজীর কথাটা আগে বলুন।

মিত্রা বলল £ কাল রাতে ক্লাবে আপনাদের কথা শুনলাম আপনার] নাকি একটা সেমিনারে যোগ দিতে এসেছেন দিন কয়েক আগে। শুনে তো ভারি খুশী। কোথায় উঠেছেন কদিন থাকবেন, এই সব খবর নিয়ে বলল, এস, কাল একটা সারপ্রাইজ দিয়ে আসি ওদের আমি, রেগে গিয়ে বললাম, ওরা নিজে থেকে না এলে আমি মার ওদের মুখদর্শন করব নাঁ। বলল, তোমরা আসবে না: আর আমি বললাম, নিশ্চয়ই আসবে এই নিয়েই বাজী |

আশ্চধ হয়ে আমি তাকালুম স্বাতির দিকে, স্বাতি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু আমি হাসতে পারলুম না। চাওলার হৃদয় আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলুম আমাদের কাছে আসৰার জন্তে চাওলা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, সময় থাকলে কাল রাতেই আসত কিংবা মিত্রাকে ছুঃখ দিতে চায় নি বলেই কাল আসে নি। আর সে নিজেও জানত যে আমর তাদের কাছে নিজে থেকে আসব না, এলে আগেই আসতুম, কিংবা খবর দিতুম তাদের চাওল] তাই এই ছলনার আশ্রয় নিয়েছে নিজের ব্যাকুলতায় ডেকে এনেছে আমাদের, আবার বাঁজীতে হেরে গিয়ে খুশী করতে চেয়েছে নিজের স্ত্রীকে আশ্চয মানুষ !

স্বাতিও বোধহয় এই রকমের কিছু ভাবছিল। বলল? কলকাতা থেকেই চিঠি লিখে খবর দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু তাড়া-

৩১

তাড়িতে ভূলে গিয়েছিলাম। তার পরে দিল্লীতে এসে সকালে বিকেলে ঝবাজ-_ভারি ব্যস্ত ছিলাম কয়েকট। দিন।

মিত্রার মেয়েকে স্বাতির কোলে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল। ফর্স। রঙ, ফুলোফুলো। গাল, গ্ল্যাক্সো বেবির মতো